অমলকান্তি


মলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।

আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।

আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

কবিঃ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৯৫

পঁচিশ বছর পরে


শে
ষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে
বলিলাম: ‘একদিন এমন সময়
আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!–
পঁচিশ বছর পরে!’
এই বলে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে;
তারপর কতবার চাঁদ আর তারা,
মাঠে মাঠে মরে গেল, ইদুর — পেচাঁরা
জোছনায় ধানক্ষেতে খুঁজে
এল-গেল। –চোখ বুজে
কতবার ডানে আর বায়ে
পড়িল ঘুমায়ে
কত-কেউ! — রহিলাম জেগে
আমি একা — নক্ষত্র যে বেগে
ছুটিছে আকাশে
তার চেয়ে আগে চলে আসে
যদিও সময়–
পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয়!–

তারপর — একদিন
আবার হলদে তৃণ
ভরে আছে মাঠে- -
পাতায় শুকনো ডাঁটে
ভাসিছে কুয়াশা
দিকে দিকে, চুড়ায়ের ভাঙা বাসা
শিশিরে গিয়েছে ভিজে — পথের উপর
পাখির ডিমের খোলা, ঠান্ডা-কড়কড়!
শসাফুল — দু-একটা নষ্ট শাদা শসা
মাকড়ের ছেঁড়া জাল, শুকনো মাকড়সা
লতায় — পাতায়;
ফুটফুটে জোছনারাতে পথ চেনা যায়;
দেখা যায় কয়েকটা তারা
হিম আকাশের গায় — ইদুর পেঁচারা
ঘুরে যায় মাঠে মাঠে, ক্ষুদ খেয়ে ওদের পিপাসা আজও মেটে,
পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে!

কবিঃ জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থঃ ধূসর পাণ্ডুলিপি

কর্তৃত্ব গ্রহণ কর, নারী

কবিঃ ফরহাদ মজহার


মি তোমার সামনে আবার নতজানু হয়েছি, নারী
না, প্রেমে নয়, আশ্লেষে নয়,
ক্ষমা চেয়ে
তোমার দয়া দিয়ে আমার হৃদয় ধুয়ে দেবার প্রার্থনায়
আমার ভেতরে যে পুরুষ তাকে আমি চাবুক মেরে শাসন করেছি
তাকে হাঁটু মুড়ে বসতে বলেছি তোমার সামনে
আমি ক্ষমা চাই, ক্ষমা করে দাও
শুধু আমাকে নয়
সমস্ত পুরুষকে তুমি ক্ষমা কর
আমি আজ সমস্ত পুরুষের হয়ে তোমার ক্ষমাপ্রার্থী

পুরুষ তোমার সামনে আবার
নতজানু হয়েছে নারী,
তাকে ক্ষমা করে দাও।

গৃহপালিত পশুর মতো তোমাকে ব্যবহার করেছে পুরুষ
আখমাড়াইয়ের কারখানার মতো তোমার জানু চেপে
তারা উৎপাদন করেছে সন্তান
টেলিভিশন বাক্সের মতো তোমার ভেতর তারা ঠেসে দিয়েছে
তাদের জগত
নীলাভ শিখার মতো জ্বলতে জ্বলতে তুমি তা প্রতিদিন
প্রচার করে যাচ্ছ-
ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের মতো অপ্রাণীবাচক তোমার অস্তিত্ব
প্লাস্টিকের পুতুলের মতো প্রাণহীন
তোমার নাম হতে পারত কাঠকয়লা
তোমার নাম হতে পারত হাতুড়ি
তোমার নাম হতে পারত শেলাইকল
তোমার নাম হতে পারত মাদীকুকুর
নরবানরেরা ঠাট্টা করে তোমার নাম রেখেছে নারী
এইসব জেনে তোমার সামনে আমি
নতমুখে এসে দাঁড়িয়েছি, নারী
আমি পুরুষ
আমাকে ক্ষমা কর।
Continue reading

বাঁচতে হলে সাজতে হয় — আল মাহমুদ



যারাই দেখতে আসে সবাই প্রশ্ন করে আমি কী ভাবছি। আমি বলি কী আর ভাববো। নিজেকে নিয়েই এখনও চিন্তাভাবনা করি। আমার চিন্তার কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু থাকে না। আর থাকলেও আমি তা দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে পারি না। জীবন কেটে যায়। উদয় ও অস্তের অনুভব আমার মধ্যেও দিনযাপনের একটা পুলক সৃষ্টি করে। আমি বসে থেকে আর কিছু করতে না পারলেও একটা লেখা শুরু করে দেই। লেখাটা গড়িয়ে যায়। চলতে শুরু করে এবং বলতে বলতে চলতে থাকে। এটা ঠিক যে, আমি থামতে জানি। কখনও ঘামতে ঘামতে সমে এসে ভ্রমের সঙ্গে মিশে যায়। এই লেখাটি আমার কান্না-হাসির আনন্দ এক অকারণ পুলক সৃষ্টি করে। আমি সৃজনের আনন্দ, সুখ, শান্তি একই সঙ্গে ভ্রান্তি ও ক্লান্তি অনুভব করি। আমি সবসময় মনে রাখি আমার অন্তরাত্মা কবিতায় সমাচ্ছন্ন। আমি কবি। স্বপ্নেও কবি, জাগরণেও কবি। কাব্য আমার স্বভাব, অভাব এবং প্রভাব। ক্রমাগত আবর্তিত করে এক ঘূর্ণায়মান চৈতন্যের বৃত্তে, সৃজনশীল রাখে। আমি এ অবস্থায় সদা আবর্তিত থাকি। এর মধ্যেই আমার সৃজনকৌশল স্ফুর্তি পায়।
Continue reading

যাওয়া — আল মাহমুদ

কবির জীবনে সম্ভবত বার্ধক্য সহনীয় নয়। তবু বার্ধক্য এসে স্বপ্ন কল্পনার জগত্ বদলে দেয়। কীভাবে যেন এসে হাজির হয়ে যায় বৃদ্ধের তামসিক একটা পৃথিবী। সত্যকে তখন স্বপ্ন মনে হয় এবং স্বপ্নকে কবিতার পঙিক্ততে পরিবর্তিত হয়ে যেতে দেখি। তবু লিখে চলি। না লিখলে স্থবিরতা এসে গ্রাস করবে এই ভয়ে। লিখতে লিখতে বয়স বেড়ে গেছে। এটা যখন মানসিকতায় প্রবেশ করে, তখন বুড়ো মানুষের স্বপ্নের জগত্ আপনা থেকেই আমার মনকে আচ্ছাদিত করে রাখে। এখন আর বন্ধু-বান্ধব কাউকে দেখি না। প্রকৃতপক্ষে কোনো বন্ধু-বান্ধব নেইও আমার। যাদের নাম মনে করতে পারি তাদের দু’একজনের চেহারা চোখের ওপর ভাসতে থাকে। কোথায় হারিয়ে গেছে আমার আন্তরিকতা, স্বপ্নচারিতা ও হৃদ্যতার পরিবেশ! একা বেঁচে আছি, একাকী থাকাই আমার নিয়তি বলে মেনে নিয়েছি। তবু দু’একজনের মুখ স্বপ্নের মতো চোখে ভেসে উঠলে জিজ্ঞাসা করি কেমন আছ বন্ধু। জবাব পাই না। কিন্তু নিজের হৃদয়ে আপনা থেকেই এর একটা জবাব তৈরি হয়ে যায়। কে যেন বলে ভালোই তো ছিলাম। তবে তুমি এখনও স্বপ্ন রচনা কর শুনে তোমাকে দেখতে এসেছি। আমি বলি আমাকে ব্যঙ্গ করতে এসেছ? একটা হাসির শব্দ গুঞ্জরিত হতে হতে আমার মস্তিষ্কে মিলিয়ে যায়। ঠাণ্ডা শূন্যতার মধ্যে আমি হাতড়ে ফিরি জীবনের কৈশোর, যৌবন এবং বর্তমানের বার্ধক্যের বিবরণ। মানুষ বুড়ো হয় কেন? মৃত্যুর জন্য?

এই প্রশ্ন করতেই একটা জবাব হা হা করে শেষে না না শব্দে মিলিয়ে যায়। অথচ মুখের রেখায় ললাটের কুঞ্চনে আপনা থেকেই ঘোষণা করে যে অভিজ্ঞতার জন্য এর প্রয়োজন ছিল। যদি বলি অনেক দেখেছি, অনেক লিখেছি, কিন্তু যাকে বলে পরিতৃপ্তি তা আমার মধ্যে তেমনভাবে লক্ষণীয় হয়নি, তবে কোনো আক্ষেপ তা অনুতাপ আমার মধ্যে একেবারেই নেই। আমি তো লেখকের জীবন কাটিয়েছি। অন্যভাবে বললে বলতে হবে, কবির জীবনই কাটিয়েছি। স্বপ্ন ও সত্যকে মিশ্রিত করেছি, বিস্মৃত করেছি। এখন কেবল মনে হয় একটু শুয়ে থাকি। আমার ঘুমের প্রয়োজন। এমন ঘুম যে ঘুমে কোনো স্বপ্ন নেই, ক্লান্তি নেই, ভ্রান্তিও নেই। একটা কথা বলতে পারি, মানুষের পুরো জীবনটাই স্বপ্নের মধ্যে কেটে যায়।

যদি তা না যেত তাহলে জীবনযাপন করা অতিশয় কষ্টসাধ্য ব্যাপার হতো। আজ বহুদূর এসে মনে হয় একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। পাতা ঝরছে, ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে এবং বলছে বিশ্রাম। অথচ আমার পথ তো ফুরোয়নি। অনেক লম্বা দীর্ঘ এক পথ চলে গেছে তেপান্তরের দিকে। এতটা পাড়ি দিয়েও আশ্চর্য আমি তো শারীরিক কোনো অসুস্থতা অনুভব করছি না। তাহলে আর কী রহস্য আছে, যা আমাকে অতিক্রম করতে হবে? এদিকে শরীরের চামড়া শিথিল হচ্ছে, কপালে কুঞ্চন দেখা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে বেড়ে গেছে ক্রমাগত চলার আকাঙ্ক্ষা। চলছি, বলছি জীবনের গল্প, যা কেউ না শুনলেও আমি নিজে অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। মনে হয় দূরের সবকিছুই আমার আয়ত্তে এসেছে। আমি যাকে যা আদেশ করি সে তাই পালন করছে। আর একটু একটু করে চোখের পাতা ঝুলে পড়ছে। সবকিছু আমার কাছে আবছা দৃষ্টির কাঁপুনির মতো কাঁপছে। আর আমি অনুভব করছি চলে যেতে হবে। শ্রান্ত, ক্লান্ত হলে চলবে না। আমি আমার পা দুটোর দিকে দৃষ্টিপাত করে কিছুক্ষণ দাঁড়াই। হঠাত্ মনে হলো আমার পদশব্দ আমাকে ছাড়িয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর কেবল বলছে যাও যাও।

[সূত্রঃ আমার দেশ, ১৫/১১/১১]

http://www.sonarbangladesh.com/articles/AlMahmud

রবীন্দ্রনাথ – আল মাহমুদ

এ কেমন অন্ধকার বঙ্গদেশ উত্থান রহিত
নৈশব্দের মন্ত্রে যেন ডালে আর পাখিও বসে না।
নদীগুলো দুঃখময়, নির্পতগ মাটিতে জন্মায়
কেবল ব্যাঙের ছাতা, অন্যকোন শ্যামলতা নেই।

বুঝি না, রবীন্দ্রনাথ কী ভেবে যে বাংলাদেশে ফের
বৃক্ষ হয়ে জন্মাবার অসম্ভব বাসনা রাখতেন।
গাছ নেই নদী নেই অপুষ্পক সময় বইছে
পুনর্জন্ম নেই আর, জন্মের বিরুদ্ধে সবাই

শুনুন, রবীন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত কবিতা
আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি
নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না
আপনার বাংলাদেশ এ রকম নিষ্ফলা, ঠাকুর!

অবিশ্বস্ত হাওয়া আছে, নেই কোন শব্দের দ্যোতনা,
দু’একটা পাখি শুধু অশত্থের ডালে বসে আজও
সঙ্গীতের ধ্বনি নিয়ে ভয়ে ভয়ে বাক্যালাপ করে;
বৃষ্টিহীন বোশেখের নিঃশব্দ পঁচিশ তারিখে।

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.