বলাই বাহুল্য, এই বৃষ্টিতে ঘরে বসেও শান্তি নেই, স্বস্তি নেই, ভাগ্যের বিপর্যয় এড়ানো মুশকিল, যে সব পরিবারের মেয়েরা চাকরি-বাকরি করে তাদের জন্য দুশ্চিন্তা। একই সাথে এক বিপর্যস্ত অবস্থা সবাইকে ঘিরে ধরেছে। ঢাকা শহর ডুবে গেছে, মানুষের দুর্দশার কোনো সীমা নেই, পরিত্রাণ নেই। অন্যান্য বছরের মতো লেখালেখির কাজ তেমন চালিয়ে যেতে পারছি না। অন্য দিকে না লিখলেও আমার মতো কবির দুর্দশার অন্ত নেই। এক অস্বস্তির মধ্যে লেখালেখির টেবিলে বসে আকাশ-পাতাল ভাবছি, কেবল ভাবলেই চলে না, ভাবনাটিকে লিখে ফেলতে হয়। কিন্তু মন স্থির না থাকলে লেখাটা এলোমেলো হয়ে যায়। কোথাকার কথা কোথায় গড়িয়ে পড়ে। সব কিছুতেই একটা বৃষ্টির বিড়ম্বনা আমাকে জাপটে ধরে রাখে। আমি ঘরের বাইরে না গেলেও বাড়ির সবাই নানা কাজে নিজেদের কর্তব্যনিষ্ঠায় ঘর ছেড়ে পা বাড়াতে হচ্ছে। আর বাইরে পা বাড়ালেই পানি। এক ডুবন্ত ঢাকা শহর, ঘরে বসে লিখব এমন রুটিন লেখায় মন ভরছে না, দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বেরুলেই তো আর দেখতে পাবো না। আর আমাকে নিয়ে যাবেই বা কে? অথচ একটি উপন্যাস লেখার তাগাদা রয়েছে, কী নিয়ে যে শুরু করি সেটা বুঝতে পারছি না। না বুঝলেও লেখাটা শুরু করতে হচ্ছে। কারণ আমাকে যারা সাহায্য করে তারা ঘরে এসে ফাঁকা বসে থাকতে চায় না। আর আমিও গালগল্প চালিয়ে যেতে পারি না। স্মৃতি থেকে চরিত্র সৃষ্টি করতে গেলে আমি শব্দটাই এসে যায়। অথচ আমাকে উচ্চে রাখতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ভাবছি আমাকে বিয়োগ করলে গল্প আর অবশিষ্ট থাকে না। গল্পের জন্যই এখন আমার প্রয়োজন আমাকে। আর আমাকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে সব ঘটনাই চলে যায় ঢাকার বাইরে। এত দূরে যে সব কথা এখন মনেও পড়ে না, কেবল কিছু মুখ মনে পড়ে। এত মুখের ভিড়ে আসল গল্পের কাঠামোটা বারবার এলোমেলো হয়ে যায়।
অদ্ভুত সব মানুষ আমার স্মৃতিতে এসে ভিড় করে। মানুষের সব গল্প তো আর যেভাবে চাই সেভাবে অক্ষরে বিম্বিত হতে চায় না। তবু আমি গল্প বানাই এবং গল্পটির একটা কূলকিনারা করতে চাই। মন বলছে এক জায়গা থেকে শুরু করলে নিশ্চয় কাহিনী যেমনই হোক তা শেষ হবে। কিন্তু আমার কাহিনী তো অবশেষ। শুরু করলেই আর সীমানা মানতে চায় না। ভয়ে ভয়ে শুরু করার বিষয়টি চিন্তা করি। যেসব মুখ ভেসে ওঠে, সেসব ভাঙিয়ে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই হাতের মুঠোতে ধরা দেয় না। এখন ভাবছি শুরুটাই আমার কাজ শেষ করার দায় আমি নিতে পারব না।
বহু দিন আগে আমার চাচার কর্মস্থলে তাদের সাথে বাস করতাম, যাদের বাড়িটিতে আমরা ভাড়া থাকতাম। তাদের ছিল নেশার দ্রব্য বিক্রি করার লাইসেন্স। নিজের যদিও নেশার দ্রব্য বিক্রির উপার্জনে সংসার চলত, কিন্তু নিজেরা কখনো নেশার দ্রব্য গ্রহণ করত না। সেই পরিবারটিও আমাদের চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ইতিহাস জানি, অত্যন্ত বেদনাময় সে ইতিহাস। হয়তো কোনো দিন সুযোগ পেলে কাহিনীটি বলা যাবে, এ মুহূর্তে আমার পাঠকদের ভারাক্রান্ত করতে চাই না। তার চেয়ে বরং এমন গল্প বলি, যা মানুষকে দুঃখ দেয় না। অনুতাপে দগ্ধ করে না। আমার মনে হয়, ইচ্ছে করলেই কিছু বানিয়ে তুলতে পারি না। যখন কারো কিছু কাহিনীসূত্র আমার মনে পড়ে তখনই মনে হয় গল্পটির সাথে আমার সম্পর্কের কথা, এরপর আর সাহসে কুলায় না। একটা কথা আগেও বলেছি, অতি দরিদ্র পরিবার থেকে আমি এসেছিলাম, সম্ভবত এ কারণেই আমার গল্পে স্বস্তিকর কিছু নেই, আবার অশ্রুজলও নেই, ধৈর্য ধারণের দৃষ্টান্ত আছে। এই দৃষ্টান্ত দিয়ে আমার তো কোনো অভাবই পূরণ হলো না।
শুধু বলতে পারি, যেমন ছিলাম তেমনি আছি। অথচ তেমনি থাকলে তো আর দিন গুজরান হয় না। মুখগুলোকে ভাঙিয়ে কিছু উপার্জন হয় কি না তা চেষ্টা করে দেখতে হবে। প্রথম যে মুখটিকে ভাঙাতে চেষ্টা করব সে বাধা দেবে না বটে, কিন্তু একবার ভাঙিয়ে ফেললে সেটা আর ফেরতও নেয়া যাবে না। এই তো এখন আমার চোখের সামনে এক নারীর মুখ ভাসছে। এটা ভাঙলে দুঃখের চেয়ে অনুতাপের জ্বালাই খুচরো হয়ে আমার ওপর ঝরে পড়বে। কেউ প্রতিবাদ করবে না বটে আমার নিজের ভেতরেই আছে আমার কাজের প্রতিবাদী অস্তিত্ব। আমি ভুল করলে সে প্রতিবাদ করে ওঠে। আমি কিছু না করলে সে দুঃস্বপ্ন হয়ে আমার নিদ্রার বেঘাত ঘটায়।
দিবস জামিনি ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম; কিন্তু দুঃস্বপ্নের পীড়নে আমার ঘুম পালিয়েছে, এখন একা জেগে থাকি।
সবসময় মনে হয় পেছনে এমন কিছু ফেলে এসেছি, যা না থাকলে মানুষ মরীচিকার হাতছানিতে কেবল স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। কোনো গন্তব্যে পৌঁছায় না। অথচ আমার প্রতিজ্ঞা হলো বাস্তব হোক বা স্বপ্নই হোক আমি কবি যখন, আমাকে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। আমি যদি নাও পৌঁছি আমার বিশ্বাস আমার কবিতা সেখানে ঠিকই পৌঁছে যাবে, আর কবিতা কবির দিকে ফিরে তাকানোর দায়দায়িত্ব নিতে চায় না, মানুষ সব পারে না, মানুষ বলেই পারে না। মানুষের মধ্যে স্মৃতি আছে, স্বপ্ন আছে, এ জন্যই মানুষ ফিরে তাকায়। মানুষের প্রতি মমতায় সিক্ত হয়ে থাকে, আমরা নাম দিয়েছি মনুষ্যত্ব, কেবল মানুষই সত্যে স্বপ্নে মিলিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে থাকে। সে নিন্দায় প্রশংসায় উত্তেজিত হলেও দুঃখে দারিদ্র্যে ভেঙে পড়ে। এই ভেঙে পড়ার কাহিনীই হলো মহাকাব্য। মহাকাব্য অবশ্য আর অখণ্ড নেই, তা শত খণ্ডে ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়াতেই মানুষ অমরতার স্বাদ আস্বাদন করে। এখনো হাসে ভালোবাসে। এই অভ্যেসটির শুধু মানুষেরই আয়ত্ত হয়েছে, জগতে আর কোনো প্রাণীরই আয়ত্ত হয়নি। কারণ, মানুষেরই ভাষা আছে আর কোনো প্রাণীরই ভাষা নেই, আছে চিৎকার।
মানুষ তার ভুলের বিবরণও লিপিবদ্ধ করে। এতে তার বুক ভেঙে যায় তবুও কাহিনী নির্মাণ মানুষের স্বভাবের অন্তর্গত, মানুষের কেচ্ছা না হলে চলে না। আর সে কেচ্ছা সব সময় যে কালিতে লেখা হয় এমন নয়, কখনো কখনো রক্তেও লেখা হয়। এর ফলেই মানুষ অর্থাৎ নর-নারী একে অন্যকে বিশ্বাস করে ঘর বাঁধে, এই বিশ্বাসটুকু না থাকলে জগৎ অরণ্যে পর্যবসিত হতো। জগতে যত বড় সৃজনশীল কর্ম হয়েছে সেখানে একজন নারী থাকবেই। কেন থাকবে তার কোনো যুক্তি নেই, যুক্তিহীন সম্পর্কের নামই হলো মানবিকতা, মানুষের সব অভ্যেসই ত্রুটিপূর্ণ। একটি অভ্যেস আছে যা তাকে অমরতা দান করেছে, তার নাম হলো প্রেম, আর কেউ জগতে প্রেমিক হতে পারেনি। একে অন্যের জন্য পাগল হওয়ার নাম প্রেম নয়।
প্রেম হলো এক স্বর্গীয় অনুভূতি। যা কেবল মানুষের মর্মে বাসা বেঁধে আছে। এ কারণেই মানুষ মৃত্যুর সামনেও মেরুদণ্ড সোজা করে চোখের ওপর চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সবই যখন পরাজিত হয় তখনো মানুষ লড়াইয়ের ময়দানে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ এটা পারে বলেই সে কবিতা লেখে এবং মৃত্যুতে কাতর হয় না। একই সাথে আমরা বলি এই তো মানব-মানবী জোড় বেঁধে আছে। এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে জগতের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল কর্ম, সব শিল্পই এই পরিস্থিতির কাছে কোনো না কোনো সময় একবার নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে মানবিকতাকে প্রেমকে একই সাথে প্রেমের পরিণতিকে শ্রদ্ধা জানায়। এতে কার কী লাভ হয় কে জানে। কিন্তু অনেক নর-নারী অমরতার স্বাদ পেয়ে আত্মদানে তুষ্ট হয়ে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়েছে। এটা শুধু মানুষই পেরেছে, আর কেউ পারেনি।
শুধু মানুষেরই দুঃখের কাহিনীর কোনো শেষ নেই, আমরা নাম দিয়েছি ট্র্যাজেডি। এই বিয়োগান্তক ঘটনা মানুষের গলাতেই জয়মাল্য পরিয়ে দিয়েছে, মানুষ জানে না তার এই জয়মাল্য কোনো কাজে লাগবে। কিন্তু মালাটি সে সবসময় গলায় পরে থাকতে চেয়েছে, এ জন্যই সে আছে। মানুষের এই সৌভাগ্যে সবাই ঈর্ষাকাতর হয়ে সমালোচনা করেছে; কিন্তু কেউ মানুষের সমকক্ষ হতে পারেনি। মানুষ তো মানুষই, তার অমরতা কবিত্ব ও স্বপ্ন তাকে এক অসাধারণ মর্যাদা দিয়েছে। এই মর্যাদা নিয়েই সে আজও আছে ভবিষ্যতেও থাকবে।
লেখকঃ কবি ও কথাশিল্পী
— আল মাহমুদ
সুত্রঃ নয়া দিগন্ত, ০২/০৮/২০০৯

