এই যে বাধ্য হয়ে লিখতে বসা, এর চেয়ে কষ্টকর কাজ আর কী আছে? তবুও যখন বসে যাই, তখন একটু একটু করে বেরিয়ে আসে কথা। অনেকটা দীর্ঘশ্বাসের মতো। আমি লিখতে লিখতে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকি। লেখাটা হয়ে গেলে খানিকটা স্বস্তি বোধ হয় বটে! কিন্তু অতৃপ্তি যায় না। শুনেছি, এই অতৃপ্তিই হলো লেখকের প্রধান সম্বল। অতৃপ্তি থেকেই জন্ম হয়েছে অনেক অমর রচনা। হয়তো হয়েছে। আমি ঠিক জানি না। শুধু এটুকু জানি, আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এক লেখক। আমাকে লিখতে হবে যতক্ষণ না কলাম পুর্ণ হয়। হয়তো এতে কিছু হয় কিংবা কিছুই হয় না। আমার অবশ্য এতে কিছুই আসে-যায় না। লেখাটা শেষ বলে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।
দুঃখ-দারিদ্র্য আর অনুশোচনায় আমি মাঝেমধ্যে হেসে ফেলি। দুঃখ যে মানুষকে শুধু কাঁদায়, এটা ঠিক নয়। দুঃখে পীড়িত হয়ে নিরুপায় মানুষ হেসেও ফেলে। আমি অবশ্য অনেক মানুষের দৃষ্টান্ত জানি। যারা জীবনকে মোটামুটিভাবে কায়ক্লেশে পার করে গেছেন। তারা হাসিমুখেই গেছেন। এ হাসিটা ঠোঁটের কোণে ঠিকমত ধরে রাখতে পারলে আমারও হয়তো মঙ্গলই হতো। কিন্তু আমি অস্হিরচিত্ত মানুষ। ধরে রাখতে পারি না। তবে আমার লেখায় হয়তো এমন কিছু থাকে, যাতে পাঠক বিষণ্ন বোধ করে। অথচ আমি কাউকে বেদনার্ত বা বিপন্ন হওয়ার অবস্হায় নিয়ে যেতে চাই না। আমি লিখতে শিখেছি আমার ভাষার গুণে। আমার ভাষাটা পরিচ্ছন্ন এবং প্রভাবিত করার পরিস্হিতি তৈরি করতে পারে। তবে যারা আমার খুব নিকটবর্তী মানুষ, তারা আমার লেখা সহজে হজম করতে পারে না।
লেখার জন্য আমি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। যদিও এর কোনো তালিকা দিতে পারব না। লেখার সময় একটা কথা বিবেচনা করি। কাউকে আঘাত দেব না। কাউকে কাউকে বিব্রতকর অবস্হায় ফেলব না। তবু আমার লেখা নিয়ে দু’একটা নালিশ উত্থাপিত হলে আমি অধোবদন হয়ে থাকি। অনেকে বলেন, তারা নিরপেক্ষ লেখক। প্রকৃতপক্ষে নিরপেক্ষ বলে কোনো লেখক থাকেন না। সবারই পক্ষপাত আছে। আমারও আছে। আমি ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বনের চেষ্টা করি। পারি কিনা সেটা কালই বিচার করবে। অতীতের অনেক লেখার জন্য আমি অনুতপ্তও হই। একবার লেখা হয়ে গেলে তা তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। সে জন্যই চিন্তা-ভাবনা-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাকার বিষয়গুলো আগে থেকেই সামলে নিয়ে লেখার কাজে এগুতে হয়।
মনে মনে ভাবি বৃহৎ কিছু সৃষ্টি করব। এমন বই তৈরি করতে হবে যাতে পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত ঘটে। কিন্তু চিত্তচাঞ্চল্যের কারণে তা হয়ে ওঠে না। তবুও আমার একটা প্রতিজ্ঞা আছে বৃহৎ কিছু সৃষ্টি করব। হয়তো মহৎ কিছু হবে না। কিন্তু মানুষের মর্ম স্পর্শ করবে। বলতে দ্বিধা নেই, আমি জানি এবং দেখেছি অনেক। সে তুলনায় এ পর্যন্ত যা লিখেছি, সেটাকে তুচ্ছ মনে হয়। মানুষের মতো এমন রহস্যময় এমন অদম্য একই সঙ্গে এমন বেপরোয়া প্রাণী জগতে অতিশয় বিরল। ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ দ্রুত ভেঙে পড়ে। এসব অবস্হা মানুষের স্বভাবেরই অন্তর্গত। এর কোন দিকটা নিয়ে একটা বৃহৎ রচনা শুরু করা যায়, আমি তা ভেবে আজও কিনারা করতে পারিনি। তবে পারিনি বলে ছাড়িওনি। যেহেতু আমি মানবরহস্য নিয়েই সারাজীবন লেখায় চেষ্টা করেছি, সে জন্য আমার দ্বারাই এর একটা কিনারা হওয়া সম্ভব। এমন একটা উপন্যাস চাই, যেখানে নারীর চেয়ে পুরুষের স্বভাবই বেশি পরীক্ষিত হবে। এর মানে নারীকে বাদ দেয়া নয়। বরং যে সব পদ্ধতিতে লেখকরা নারীর হৃদয়বৃত্তের ঘটনা বর্ণনা করেছেন, আমি সেসব অনুসরণ না করে নারীর মনোবৃত্তি এবং একইসঙ্গে দয়ামায়া, মাতৃত্ব এবং এক সংহারিণীর স্বরুপ বিশ্লেষণ করতে চাই। এতে আমরা উপন্যাস রচনায় যে প্রেমভাবকে প্রাধান্য দিই, সেটার বিপরীত ঘটনাধারা উপস্হিত করতে পারব বলে আমায় আত্মবিশ্বাস আমাকে ঠেলছে। একবার হাত দিতে পারলে একটা কিছু তো দাঁড়াবেই। আমি অভ্যস্ত লেখক। পরিশ্রম করতেও জানি। তবে পরাভব স্বীকার করতে এখনও রাজি নই।
আমার মনে হয়, আমি পারব। আর না পারলেও না পারার একটি দৃষ্টান্ত আমার অদৃষ্টে লেগে থাকুক না। আমার তো শরম পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ লেখাটাই আমার উপজীবিকা। প্রকৃতপক্ষে লেখাটাই আমার অন্ন সংস্হানের উপায়। আমি লিখে খাই, লিখে ঘুমাই। দুঃস্বপ্ন বড় একটা দেখি না। মানুষ নিয়ে আমার কৌতুহল, মানুষ নিয়ে আমার জিজ্ঞাসা এবং মানুষকে জড়িয়েই আমার শান্তি।
লেখকঃ কবি ও কথাশিল্পী
— আল মাহমুদ
সুত্র, আমার দেশ,২৮/০৭/২০০৯

