আমার দিবস যামিনী যত বেদনাময়ই হোক মোটামুটিভাবে কেটে যাচ্ছে। বেঁচে যে আছি এ প্রমাণ হলোঃ এই তো লিখছি। লেখাটা আমার বেঁচে থাকারই একটা পরিস্থিতি মাত্র। এর মধ্যে বিদেশে যাওয়ার একটি আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছে। সামর্থ্যে, স্বাস্থ্যে ও আমার পরিবেশে মিল হলো না বলে কোথাও না যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিতে হলো, অথচ এ সময় বাইরে বেড়িয়ে আসতে পারলে কতই না ভালো হতো। পারিনি যে তাতেও তো অবশ্য আমার জন্য হয় তো মঙ্গলই আছে। কোথাও না গেলেও তো লেখার যন্ত্রণা আমার জন্য ঘরে উঁচু হয়ে বসে থাকে। প্রকৃত বড় কাজ করতে পারছি না বলে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে। লিখতে না পারার কোনো কৈফিয়ত নেই। তবু কিছু মানুষ আমার অবস্থা জানতে আগ্রহ ব্যক্ত করে, আমি তো লিখতে সদাসর্বদা একরকম প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে চাই। পারি না, কারণ নানা পারিবারিক সমস্যা আমারও তো আছে। তা ছাড়া লেখা একটা আনন্দ ও উত্তেজনার ব্যাপার। সব সময় তা হাতড়ে পাই না, তবু লেখার জন্য একটু-আধটু চিন্তাভাবনা করি। যারা লেখালেখিটাকে জীবিকা অর্জনের বিষয় করে নিয়েছেন তারা তো জীবিকার তাগিদেই লিখতে বসবেন। আমিও বসি। কিন্তু মনের মতো করে চিন্তাভাবনা গুছিয়ে ব্যক্ত করতে পারি না। আর না পারলে আমার মধ্যে মানসিক যাতনা হয়। লেখাটাকে আমার জীবনের একটা কর্তব্যের মধ্যে ধরে রেখেছি। এখন কোনো অবহেলা বা আলস্য এসে তা দখল করে নিতে চাইলে কী করে সম্মত হতে পারি? দিল খোলা লেখা লিখতে চাই। এটা অবশ্য সব সময় হয় না।
আমার জীবনে সাফল্য ও পরাভব সমান্তরালভাবে বয়ে গেছে। জিতেছি এবং অস্বীকার করি না হেরেছিও। হারাটা অনেক সময়ই আমাকে কষ্ট দিয়েছে। এই হার-জিতের মধ্যে কোথায় চলেছি, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারছি না। আমার লেখকজীবন মোটামুটিভাবে স্বার্থকতায় পৌঁছেছে বলে ধারণা হয়। সবার কাছেই আমি কবি। কবি ছাড়া আর কিছু নই। এটাই হতে চেয়েছিলাম। এখন তো মনে হয়, যা হতে চেয়েছিলাম সেই জীবন আমার আয়ত্তে এসেছে। যদিও স্বীকার করি এই জীবন সুখের নয়। দুঃখ-দারিদ্র্য, রোগ-শোক আমাকে সব সময় আঁকড়ে ধরে রেখেছে। আর আমি কিনা ঘোষণা করে চলেছি আমি কবি। নিজের কাছে বিষয়টাকে কেমন হাস্যকর মনে হয়। কিন্তু বহু দিন যাবৎ প্রাণ খুলে হাসতে পারিনি। উচ্চহাস্য তো একদম ভুলে গেছি। এই অবস্থাতে কবিরা সাধারণত হার মেনে যান কিংবা চুপ করে নিজের অঞ্চল থেকে পালিয়ে যান। পালাইনি। হারও স্বীকার করিনি। ঘাড় নিচু করে চিরকাল যেমন শস্য ফলিয়েছি এখনো আমার বপন ক্ষেত্রে উঁচু হয়ে রেখে যাচ্ছি শস্যের বীজ। হয়তো এর ফলাফল দেখার জন্য থাকব না। কিন্তু আমার শস্যভাণ্ডার থাকবে কারো জন্য। আমার কথা কেউ মনে রাখুক বা না রাখুক অকৃপণভাবে আমার বপন ক্ষেত্রগুলোতে শস্যের বীজ বপন করে গেছি। আমার দু’চোখে আশা ও স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু ছিল না।
সারাজীবন লিখেছি। এই একটি কাজই জানি। আর কিছু শিখিনি। আর শিখবই বা কার কাছে? আমি তো শিখেছিলাম প্রকৃতির কাছে। গাছপালা, নদী-নালা এই যে নিসর্গ চিত্র; এরাই ছিল আমার শিক্ষক, আমি শিখেছি উদারভাবে। আমার পথের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা সবকিছুকে একদা ভালোবেসেছিলাম। আজো বাসি। কিন্তু চোখের বিপর্যয়ের কারণে আমার দৃষ্টিতে নিসর্গ দৃশ্যরাজি আর আগের মতো প্রতিভাত হয় না। অনেক কিছুকে ভালোবেসেছিলাম। এর মধ্যে মানুষই প্রধান। মানুষের মধ্যেও নরম প্রকৃতির হলেন মেয়েরা। বলা যায় তাদের সাথে আমার কিছুকাল বনিবনা হয়েছিল। কিন্তু দেয়া-নেয়া করতে গিয়ে যেখানে কৃপণতার পরিচয় পায় সেখানে দাঁড়ায় না। এই কার্পণ্য আমাকে অনেক প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমি বিষণ্ন মুখে আপনজনদের ফেলে চলে এসেছি। আমার মধ্যে কোনো হাহাকার নেই। তবে কী যেন একটা বুকের মধ্যে জমে আছে। এ কী অনুতাপ? অনুশোচনা? নাকি সবকিছুতে আমার অনাগ্রহ ছড়িয়ে পড়ার পরিণাম দেখতে পাচ্ছি। কতবার বলেছি এত কষ্ট-যাতনার কথা জানা থাকলে আমি এই জীবন বেছে নিতাম না। কিন্তু অদৃশ্য থেকে কেউ যেন মুচকি হেসে বলছে, এই দুঃখ-যাতনার কথা জানা থাকলেও তুমি এই জীবনই বেছে নিতে। কথাটা ধ্রুব সত্য? হয়তো এটাই খাঁটি সত্য। আমরা সত্যের মুখ দেখতে চাই না। আর সত্যও সম্ভবত কবিদের দেখলে বিব্রতবোধ করে।
এই জগতে কবির মতো দুঃখী মানুষ কেন যে জন্মায়। তবু এ দেশের মাটির স্বভাব হলো সহনশীলতা। আমি সহ্য করতে পেরেছি বলেই না আছি। কত কিছু করব বলে মনে মনে স্থির করি। একটু পরেই এমন চিত্তচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় আমি আর স্থির থাকতে পারি না। সব কিছুই কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। সব কিছু উলট-পালট হওয়ার পর যেটুকু আমার ভাগ্যের বিধান বলে অবশিষ্ট থাকে সেখানে কোনো হতাশা নেই। আশাও আছে বলে মনে করতে পারি না। এই আশা-হতাশার ঘূর্ণিপাকের মধ্যে কিছু পঙ্ক্তি রচনা করি। এই জারিত অমৃত রসের নামই হলো কবিতা। এ পর্যন্ত এটুকুই জেনেছি। আরো বেশি দিন বাঁচলে হয়তো নতুন কিছু জানব। তত দিনে কত প্রিয়জন আমাকে ছেড়ে যাবে তা জানি না। আমার অনুতাপ হলো, যা বলতে চেয়েছিলাম তা মুখ ফুটে বলতে পারিনি।
আমার চেয়ে দুঃখিত মানব-মানবী আরো কেউ আছে কি না সেটাও আন্দাজ করতে পারছি না। সৃজনশীল মানুষের মতো স্বার্থপর ছিলাম না। কিছু দিলে আমি নিয়েছি। প্রতিদানও দিয়েছি। এখন ভাবছি দেয়া-নেয়ার হিসাবটা কারা করবেন। যদি আমার কিছু প্রাপ্য অবশিষ্ট থাকে তাহলে তা যেন আমি থাকি আর না থাকি আমার হিসেবের খাতায় তা উল্লেখ করা হবে। কত কিছুই তো আমার প্রাপ্য ছিল। আমি তো তা পাইনি। পাইনি বলে আক্ষেপেও কাল কাটাইনি। সন্তুষ্টচিত্তে এক বিমর্ষ অবস্থায় আমার জীবন অতিবাহিত করে দিয়েছি। আর ক’টা দিন মাত্র বাকি। আমার একান্ত বাসনা সেই দিনগুলোও আমি স্বস্তির মধ্যে পার করে দিতে পারব। যদি দেখা যায়, আমি কারো কাছে ঋণী হয়ে আছি তাহলে– সেই ঋণ শোধ করার আর কোনো উপায় নেই। লিখতে এসেছিলাম লিখেছি। বলা যায় বিপুল পরিমাণ লেখা আমার উপচে পড়েছে। লেখা থেকেই শুরু হয়েছে আমার জীবন, লেখার ব্যাপারে আপনজনদেরও দুঃখ-দুর্দশার দিকে চোখ মেলে তাকাতে পারিনি। এর কী পুরস্কার আমার লভ্য হয়েছে? দেখুন আমার হাত দু’টি খালি। এই খালি হাত নিয়ে আমাকে এখন চলে যেতে হচ্ছে। এটাই তো কবির জীবন। না স্বপ্ন, না সত্য; আমি নালিশ করব কার কাছে। এটুকু জানি সাহিত্যের একটা ইতিহাস আছে, সেখানে ব্যর্থ লোকদের নামও লেখা হয়ে যায়। অবশ্য কোনো অবস্থাতেই নিজেকে ব্যর্থ ভাবিনি, বরং সাফল্যের এক দৃষ্টান্তই হতে পারি আমি। সাফল্য এই অর্থে যে লিখেছি; কখনো অলস-অসাবধানতায় সময় ব্যয় করিনি। এত যে লেখা তার একটা মূল্য তো কেউ না কেউ আমাকে দেবে। যদি আমার জীবনে এই মূল্য নির্ধারিত না হয় তাহলে আমার অনুপস্থিতকালে তার দাম চুকাতে হবে। এই ভরসা নিয়ে সব কবি কালের অন্ধকারে মিলিয়ে গেছেন। আমারও সময় এগিয়ে আসছে।
লেখকঃ কবি ও কথাশিল্পী
— আল মাহমুদ
সুত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২৬/০৭/২০০৯

