বাঁচতে হলে সাজতে হয় — আল মাহমুদ



যারাই দেখতে আসে সবাই প্রশ্ন করে আমি কী ভাবছি। আমি বলি কী আর ভাববো। নিজেকে নিয়েই এখনও চিন্তাভাবনা করি। আমার চিন্তার কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু থাকে না। আর থাকলেও আমি তা দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে পারি না। জীবন কেটে যায়। উদয় ও অস্তের অনুভব আমার মধ্যেও দিনযাপনের একটা পুলক সৃষ্টি করে। আমি বসে থেকে আর কিছু করতে না পারলেও একটা লেখা শুরু করে দেই। লেখাটা গড়িয়ে যায়। চলতে শুরু করে এবং বলতে বলতে চলতে থাকে। এটা ঠিক যে, আমি থামতে জানি। কখনও ঘামতে ঘামতে সমে এসে ভ্রমের সঙ্গে মিশে যায়। এই লেখাটি আমার কান্না-হাসির আনন্দ এক অকারণ পুলক সৃষ্টি করে। আমি সৃজনের আনন্দ, সুখ, শান্তি একই সঙ্গে ভ্রান্তি ও ক্লান্তি অনুভব করি। আমি সবসময় মনে রাখি আমার অন্তরাত্মা কবিতায় সমাচ্ছন্ন। আমি কবি। স্বপ্নেও কবি, জাগরণেও কবি। কাব্য আমার স্বভাব, অভাব এবং প্রভাব। ক্রমাগত আবর্তিত করে এক ঘূর্ণায়মান চৈতন্যের বৃত্তে, সৃজনশীল রাখে। আমি এ অবস্থায় সদা আবর্তিত থাকি। এর মধ্যেই আমার সৃজনকৌশল স্ফুর্তি পায়।

তখন কলম হাতে নিয়ে হৃদয়ের ক্ষতে মলম লাগাই। হৃদয় ও আত্মা ঈষত্ শান্ত হয়ে এলে আমি একটা কিছু রচনায় অনুপ্রাণিত হই। লিখি অনেক কিছুই এবং অযৌক্তিক বিষয়াদি ক্রমাগত যুক্তির আশপাশে এসে মাথানত করে দাঁড়ায়। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে সুখ পাই। আমি যুক্তির জানালায় দাঁড়িয়ে কপাট খুলে দেই। হাওয়া এসে আমাকে শীতল ও অভিভূত করে ফেলে। আসলে আমি আবার আমাতে ফিরে আসি। তখন সব কথাই কাব্য হয়ে যায়। আর সব কাব্যই সঙ্গীতে পর্যবসিত হয়। এই যে সুখ এর নামই একসময় আমি রেখেছিলাম আনন্দের আস্বাদন বলে। জীবন শুধু সুখে স্বস্তি পায় না। জীবনে দুঃখকেও আলিঙ্গন করতে হয়। সুখ-দুঃখের এই পর্যায়ক্রমিক খেলা থেকে কবি এক সময়ে পরিত্রাণ চায়। এ পরিত্রাণের নামই হলো তৃপ্তি কিংবা পরিতৃপ্তি। সবাই এ গেলাসভরা অমৃত পান করতে উন্মুখ। তবে যারা সাধারণত সৃজনকর্ম না করে কেবল সুখের মদিরা পান করতে চায় তাদের ভাগ্যে অঘটন ঘটে। দেখা যায় যে, তাদের গণ্ডুসভরা অমৃত পানসে মনে হয়।

যা হোক, মানুষকে সৃষ্টিশীলতার উন্মাদনায় রাখতে হলে সব সময় একটি উত্তেজক বিষয় থাকা দরকার। মানুষকে শুধু কর্তব্যের তাগাদা দিলে চলে না। তাকে সুখ দিতে হয়। শান্তি দিতে হয়, তৃপ্তি দিতে হয় এবং সর্বোপরি অনুপ্রেরণায় অভিষিক্ত রাখতে হয়। মানুষ সব পারলেও যাকে বলে সৃজনক্ষমতা সেটা নিজের মুঠোতে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। এর জন্য দরকার ক্রমাগত সৃজনশীলতার বেদনাকে বেগবান করা। আর মানুষ যখন সৃষ্টির আনন্দ একবার নিজের করতলে নিয়ে আসতে পারে, তখন সে নিজেই নিজের বেদনাকে সুখে পর্যবসিত করে দিতে পারে। তখন তার হাসিতে কোথাও যেন রোদনধ্বনি লুকিয়ে আছে বলে শ্রোতাদের ধারণা হয়। এ অবস্থা বুকের মধ্যে পুলকঘন শিহরণ সৃষ্টি করে দেয়। মানুষ আবিষ্কার করে বাঁচার প্রকৃত অর্থ বা আনন্দ। বাঁচতে হলে সাজতে হয় এবং সেই সাজ সবারই চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। মানুষের সাজসজ্জা সৌন্দর্য সব কিছু মিলিয়ে এমন একটা পরিবেশ তাকে ঘিরে ধরে যে, সে মনে করে তার দেহ থেকে আনন্দের বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আপনা থেকেই সৃষ্টি হয় না। এর জন্য দরকার গভীর আত্মপোলব্ধি। নিজকে জানতে জানতে প্রেমকে জানা। আর প্রেমের হাতে সমর্পণ করে দেয়া নিজের সব গোপনীয়তা। যেন কোনো কিছুই লুকায়িত নেই। সবই ভালোবাসার হাতে সমর্পিত।

লেখক : কবি
[সূত্রঃ আমার দেশ, ১৮/১০/১১]

http://www.sonarbangladesh.com/articles/AlMahmud

Advertisement

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.