যাওয়া — আল মাহমুদ

কবির জীবনে সম্ভবত বার্ধক্য সহনীয় নয়। তবু বার্ধক্য এসে স্বপ্ন কল্পনার জগত্ বদলে দেয়। কীভাবে যেন এসে হাজির হয়ে যায় বৃদ্ধের তামসিক একটা পৃথিবী। সত্যকে তখন স্বপ্ন মনে হয় এবং স্বপ্নকে কবিতার পঙিক্ততে পরিবর্তিত হয়ে যেতে দেখি। তবু লিখে চলি। না লিখলে স্থবিরতা এসে গ্রাস করবে এই ভয়ে। লিখতে লিখতে বয়স বেড়ে গেছে। এটা যখন মানসিকতায় প্রবেশ করে, তখন বুড়ো মানুষের স্বপ্নের জগত্ আপনা থেকেই আমার মনকে আচ্ছাদিত করে রাখে। এখন আর বন্ধু-বান্ধব কাউকে দেখি না। প্রকৃতপক্ষে কোনো বন্ধু-বান্ধব নেইও আমার। যাদের নাম মনে করতে পারি তাদের দু’একজনের চেহারা চোখের ওপর ভাসতে থাকে। কোথায় হারিয়ে গেছে আমার আন্তরিকতা, স্বপ্নচারিতা ও হৃদ্যতার পরিবেশ! একা বেঁচে আছি, একাকী থাকাই আমার নিয়তি বলে মেনে নিয়েছি। তবু দু’একজনের মুখ স্বপ্নের মতো চোখে ভেসে উঠলে জিজ্ঞাসা করি কেমন আছ বন্ধু। জবাব পাই না। কিন্তু নিজের হৃদয়ে আপনা থেকেই এর একটা জবাব তৈরি হয়ে যায়। কে যেন বলে ভালোই তো ছিলাম। তবে তুমি এখনও স্বপ্ন রচনা কর শুনে তোমাকে দেখতে এসেছি। আমি বলি আমাকে ব্যঙ্গ করতে এসেছ? একটা হাসির শব্দ গুঞ্জরিত হতে হতে আমার মস্তিষ্কে মিলিয়ে যায়। ঠাণ্ডা শূন্যতার মধ্যে আমি হাতড়ে ফিরি জীবনের কৈশোর, যৌবন এবং বর্তমানের বার্ধক্যের বিবরণ। মানুষ বুড়ো হয় কেন? মৃত্যুর জন্য?

এই প্রশ্ন করতেই একটা জবাব হা হা করে শেষে না না শব্দে মিলিয়ে যায়। অথচ মুখের রেখায় ললাটের কুঞ্চনে আপনা থেকেই ঘোষণা করে যে অভিজ্ঞতার জন্য এর প্রয়োজন ছিল। যদি বলি অনেক দেখেছি, অনেক লিখেছি, কিন্তু যাকে বলে পরিতৃপ্তি তা আমার মধ্যে তেমনভাবে লক্ষণীয় হয়নি, তবে কোনো আক্ষেপ তা অনুতাপ আমার মধ্যে একেবারেই নেই। আমি তো লেখকের জীবন কাটিয়েছি। অন্যভাবে বললে বলতে হবে, কবির জীবনই কাটিয়েছি। স্বপ্ন ও সত্যকে মিশ্রিত করেছি, বিস্মৃত করেছি। এখন কেবল মনে হয় একটু শুয়ে থাকি। আমার ঘুমের প্রয়োজন। এমন ঘুম যে ঘুমে কোনো স্বপ্ন নেই, ক্লান্তি নেই, ভ্রান্তিও নেই। একটা কথা বলতে পারি, মানুষের পুরো জীবনটাই স্বপ্নের মধ্যে কেটে যায়।

যদি তা না যেত তাহলে জীবনযাপন করা অতিশয় কষ্টসাধ্য ব্যাপার হতো। আজ বহুদূর এসে মনে হয় একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। পাতা ঝরছে, ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে এবং বলছে বিশ্রাম। অথচ আমার পথ তো ফুরোয়নি। অনেক লম্বা দীর্ঘ এক পথ চলে গেছে তেপান্তরের দিকে। এতটা পাড়ি দিয়েও আশ্চর্য আমি তো শারীরিক কোনো অসুস্থতা অনুভব করছি না। তাহলে আর কী রহস্য আছে, যা আমাকে অতিক্রম করতে হবে? এদিকে শরীরের চামড়া শিথিল হচ্ছে, কপালে কুঞ্চন দেখা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে বেড়ে গেছে ক্রমাগত চলার আকাঙ্ক্ষা। চলছি, বলছি জীবনের গল্প, যা কেউ না শুনলেও আমি নিজে অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। মনে হয় দূরের সবকিছুই আমার আয়ত্তে এসেছে। আমি যাকে যা আদেশ করি সে তাই পালন করছে। আর একটু একটু করে চোখের পাতা ঝুলে পড়ছে। সবকিছু আমার কাছে আবছা দৃষ্টির কাঁপুনির মতো কাঁপছে। আর আমি অনুভব করছি চলে যেতে হবে। শ্রান্ত, ক্লান্ত হলে চলবে না। আমি আমার পা দুটোর দিকে দৃষ্টিপাত করে কিছুক্ষণ দাঁড়াই। হঠাত্ মনে হলো আমার পদশব্দ আমাকে ছাড়িয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর কেবল বলছে যাও যাও।

[সূত্রঃ আমার দেশ, ১৫/১১/১১]

http://www.sonarbangladesh.com/articles/AlMahmud

Advertisement

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.